আরবি ১২ মাসের নাম বাংলায় জেনে নিন

একজন মুসলমান হিসেবে আরবি বছরের ১২ মাসের নাম মনে রাখা খুবই জরুরি। আমরা বেশিরভাগ সময় ইংরেজি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চলি, তাই ইসলামি ক্যালেন্ডারের মাসগুলোর নাম অনেকেই জানি না বা ভুলে যাই।

আরবি মাসগুলো চাঁদ দেখার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়। এজন্য এই ক্যালেন্ডারটিকে চন্দ্রভিত্তিক ক্যালেন্ডার বলা হয়। আমরা একে ইসলামি ক্যালেন্ডার বা হিজরি ক্যালেন্ডার নামেও চিনি।

আরবি ক্যালেন্ডারের ১২ মাসের প্রতিটিরই নিজস্ব নাম, অর্থ ও গুরুত্ব রয়েছে। এই নামগুলো আরবি ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গঠিত। প্রতিটি মাসের নামের পেছনে একটি বিশেষ ইতিহাস ও তাৎপর্য আছে, যা ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

আরবি ১২ মাসের নাম বাংলায় জেনে নিন

আরবি 12 মাসের নাম বাংলায়

ক্র.মাসের নাম (বাংলা)আরবি নামউচ্চারণ (Transliteration)
মুহররমمحرمMuharram
সফরصفرSafar
রবিউল আউয়ালربيع الأولRabi-ul-Awwal
রবিউস সানিربيع الثانيRabi-us-Sani (Rabi al-Thani)
জমাদিউল আউয়ালجمادى الأولىJumada al-Awwal
জমাদিউস সানিجمادى الثانيةJumada al-Sani (Jumada al-Thaniyah)
রজবرجبRajab
শাবানشعبانSha‘ban
রমজানرمضانRamadan
১০শাওয়ালشوالShawwal
১১জিলকদذو القعدةDhu al-Qa‘dah
১২জিলহজ্জذو الحجةDhu al-Hijjah

 

ইসলামি ১২ মাসের ফজিলত ও গুরুত্ব

মুহররম (محرم)

মুহররম হিজরি সালের প্রথম মাস। এটি খুবই পবিত্র মাস। এই মাসে যুদ্ধ করা নিষেধ।
এই মাসের ১০ তারিখে আশুরা দিবস পালিত হয়।
এই দিনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে —

  • হযরত মুসা (আঃ)-কে আল্লাহ ফেরাউনের হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন।

  • কারবালার ময়দানে হযরত ইমাম হুসাইন (রাঃ) শাহাদাত বরণ করেন।

এই দিনে রোজা রাখলে আল্লাহ গত বছরের গুনাহ মাফ করে দেন।

সফর (صفر)

সফর হলো হিজরি সালের দ্বিতীয় মাস। এই মাসে কোনো বিশেষ আমল বা ফজিলত নেই।
আগের যুগে কিছু মানুষ এই মাসকে অশুভ ভাবত, কিন্তু ইসলাম বলেছে —

“সফর মাসে কোনো অশুভতা নেই।”
তাই এই মাসেও স্বাভাবিকভাবে নামাজ, দোয়া আর ভালো কাজ চালিয়ে যেতে হবে।

রবিউল আউয়াল (ربيع الأول)

রবিউল আউয়াল মাসটি মুসলমানদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই মাসেই আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) জন্মগ্রহণ করেন।
১২ই রবিউল আউয়াল তাঁর জন্মদিন, যা ঈদে মীলাদুন্নবী নামে পরিচিত।
এই মাসে নবীজির জীবন, তাঁর শিক্ষা ও আদর্শ মনে করে চলা উচিত।

রবিউস সানি (ربيع الثاني)

রবিউস সানি হিজরি সালের চতুর্থ মাস।
এই মাসে কোনো নির্দিষ্ট ফজিলত নেই, তবে ইবাদত, দোয়া আর ভালো কাজ করা সব সময়ের মতোই উত্তম।

জমাদিউল আউয়াল (جمادى الأولى)

এই মাসটি হিজরি বছরের পঞ্চম মাস।
বিশেষ কোনো ফজিলত না থাকলেও এটি ইবাদত ও নেক কাজ করার মাস।

জমাদিউস সানি (جمادى الثانية)

এই মাসে নবী করিম (সাঃ)-এর প্রিয় কন্যা হযরত ফাতিমা (রাঃ) ইন্তেকাল করেন।
এছাড়া এই মাসে মুসলমানরা এক যুদ্ধ “মু’তা যুদ্ধ”-এ বিজয় লাভ করেন।
এই মাস আমাদের ত্যাগ, ধৈর্য আর আল্লাহর প্রতি ভরসা রাখতে শেখায়।

রজব (رجب)

রজব হলো চারটি পবিত্র মাসের একটি।
এই মাসের ২৭ তারিখে মিরাজের ঘটনা ঘটে।
এই রাতে নবী করিম (সাঃ) মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে যান এবং সেখান থেকে আসমানে উঠেন।
এই রাতে নামাজ ফরজ হওয়ার নির্দেশ আসে।
 এই মাসে নামাজ, রোজা ও দোয়া করা অনেক সওয়াবের কাজ।

শাবান (شعبان)

শাবান মাসের ১৫ তারিখে শবে বরাত বা লাইলাতুল বরাত পালিত হয়।
এই রাতে আল্লাহ অনেক মানুষকে ক্ষমা করেন এবং তাদের পরবর্তী বছরের ভাগ্য ঠিক করেন।
এই মাসে নবী করিম (সাঃ) অনেক রোজা রাখতেন।
এছাড়া এই মাসেই নামাজের কিবলা পরিবর্তন হয় — বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে কাবা শরীফের দিকে।

রমজান (رمضان)

রমজান মাস হলো মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বরকতময় মাস।
এই মাসে আল্লাহ রোজা ফরজ করেছেন।

রমজানের বিশেষ দিকগুলো হলো:

  • রোজা রাখা: সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া ও খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা।

  • কুরআন নাজিল: এই মাসেই কুরআন অবতীর্ণ হয়েছিল।

  • লাইলাতুল কদর: রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোর একটিতে ঘটে, যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম।

  • তারাবিহ নামাজ ও ইতেকাফ: আল্লাহর কাছ থেকে ক্ষমা ও রহমত চাওয়ার জন্য বিশেষ ইবাদত।

  • সেহরি ও ইফতার: রোজার শুরু ও শেষের খাবার, যা মুসলমানদের মধ্যে একতা বাড়ায়।

  • ঈদুল ফিতর: রমজানের শেষে আনন্দের ঈদ, কৃতজ্ঞতার প্রতীক।

শাওয়াল (شوال)

শাওয়াল হলো রমজানের পরের মাস।
এই মাসের প্রথম দিনেই ঈদুল ফিতর হয়।
এছাড়া এই মাসে ছয়টি রোজা রাখা খুবই ফজিলতপূর্ণ।
নবী করিম (সাঃ) বলেছেন —

“যে রমজানের রোজার পর শাওয়ালে ছয়টি রোজা রাখে, সে যেন সারা বছর রোজা রাখল।”
এই মাসে উহুদের যুদ্ধ হয়েছিল এবং নবী করিম (সাঃ)-এর সাথে আয়েশা (রাঃ)-এর বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল।

জিলকদ (ذو القعدة)

জিলকদ হলো একাদশ মাস এবং এটি চারটি পবিত্র মাসের একটি।
এই মাসে যুদ্ধ করা নিষেধ।
ইসলামের ইতিহাসে হুদাইবিয়ার সন্ধি এই মাসে হয়েছিল।
এই মাসে মানুষ হজ্জের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে।

জিলহজ্জ (ذو الحجة)

জিলহজ্জ হলো হিজরি বছরের শেষ মাস এবং এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

এই মাসের বিশেষ দিকগুলো হলো:

  • হজ্জ: ৮ থেকে ১২ জিলহজ্জ পর্যন্ত হজ্জ পালন করা হয়, যা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি।

  • ঈদুল আযহা: ১০ জিলহজ্জে কুরবানির ঈদ হয়, যা হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর ত্যাগের স্মৃতি বহন করে।

  • আরাফাতের দিন: ৯ জিলহজ্জ, এটি হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই দিনে রোজা রাখলে দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়।

  • তাকবিরে তাশরিক: ৯ থেকে ১৩ জিলহজ্জ পর্যন্ত নামাজের পর তাকবির পড়া হয়।

  • তাশরিকের দিন: ১১, ১২ ও ১৩ জিলহজ্জে হাজিরা মিনায় অবস্থান করে ইবাদত করেন ও শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করেন।

বাংলাদেশে এখন মুসলিম বিশ্বের প্রায় সব দেশেই আরবি মাসগুলোর গুরুত্ব রয়েছে। ইসলামিক ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো আরবি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পালন করা হয়। এসব মাসে অনেক দেশে সরকারি ছুটি দেওয়া হয় এবং বিশেষ ইবাদতের আয়োজন থাকে। যেমন রমজান মাসে মুসলমানরা রোজা রাখে, ইফতারের আয়োজন করে এবং তারাবির নামাজ পড়ে। রমজান মাস মুসলমানদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *